নতুন রুকস্যাক নেব! কোনটা ভালো! কি দেখে কিনব! 7 tips to choose rucksack

ট্রেকিং ব্যাগ বা রুক্‌স্যাক কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ, ঠিক মতো দেখেশুনে নিলে বন্ধুর মতো পাশে থাকে"। নাহলে, সামান্য ছোটোখাটো সমস্যাই বড় কারন হয়ে পুরো জার্নিটার মুড নষ্ট করে দেয়। তোমাদেরও যাতে সমস্যায় পড়তে না হয়। বিশেষ করে যারা প্রথম ট্রেকের জন্য ব্যাগ কিনবে ভাবছ তাদের কথা ভেবেই এই ব্লগটা।

রুকস্যাক বিভ্রাট ১.

জীবনের প্রথম কোনও ট্রেকে যাব! এক্সাইটমেন্টের গুঁতোয় চলে গেলাম ট্রেকিং ব্যাগ অর্থাৎ রুকস্যাক কিনতে। ব্যাস, আর কি 70 + 10 L এর এক্সপেডিশনের রুকস্যাক (Rucksack) নিয়ে ফিরে এলাম ড্যাং ড্যাং করে।  

এদিকে আমার হাইট ছোট, হাঁটতে হাঁটতে কোমরের নিচে বারবার রুকস্যাক গলে যাচ্ছে, ফিতে অ্যাডজাস্ট করেও বড় থেকে যাচ্ছে। তার ওপর আবার কাঁধের প্যাডিং পাতলা, এক ঘণ্টা হাঁটার পরেই কাঁধ এমন ব্যাথা হয়ে গেল, রুকস্যাক নিয়ে হাঁটার বারোটা বেজে গিয়ে ট্রেকের মজাটাই নষ্ট।

রুকস্যাক বিভ্রাট ২.   

সেপ্টেম্বরে সিকিমে ট্রেক বেশ আনন্দে হাঁটছি, হঠাৎ কথা থেকে মেঘ ছুটে এসে পুরো ভিজিয়ে দিয়ে চলে গেল। নিজে তো ভিজলাম সঙ্গে ব্যাগটাও ভিজে গিয়ে স্যাকের ভেতরের সবকিছু ভিজে গেল। আর জামাকাপড় ভিজে গিয়ে ওজনও দিগুন।

“ট্রেকিং ব্যাগ বা রুকস্যাক কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ , ঠিক মতো দেখেশুনে নিলে বন্ধুর মতো পাশে থাকে”। আর নাহলে, সামান্য ছোটোখাটো সমস্যাই বড় কারন হয়ে পুরো জার্নিটার মুড নষ্ট করে দেয়। সেই কারনে, তোমাদেরও যাতে সমস্যায় পড়তে না হয়। বিশেষ করে যারা প্রথম ট্রেকের জন্য ব্যাগ কিনবে ভাবছ তাদের কথা ভেবেই এই ব্লগটা।

মনে রাখবে, না বুঝেশুনে ব্যাগ কেনা মানে আন্দাজে ওষুধ খাওয়ার মতো। ঠিক মতো পড়লে আরোগ্য, আর নাহলে মায়ের ভোগ্য।

নতুন রুকস্যাক বা ট্রেকিং ব্যাগ নেওয়ার সময় কি কি জিনিস দেখে নেবে –

নতুন রুকস্যাক নেওয়ায় সময় কিন্তু খুঁটিনাটি সব দেখেশুনে নেবে। আমি যেমন ভাবে রুকস্যাক কিনি সেই অনুযায়ী কয়েকটা লিস্টের মাধ্যমে জানানোর চেষ্টা করলাম।

১। নিজের উচ্চতা অনুযায়ী নতুন রুকস্যাক বাছাই

যে রুকস্যাক পছন্দ, কিনে ফেলার আগে সেটা একবার কাঁধে নিয়ে দেখাটা হবে সবথেকে বুদ্ধিমানের কাজ। ব্যাগ পিঠে চাপিয়ে আগে ব্যাগের হিপ্‌বেল্ট কোমরে আটকে নেবে। তারপর কাঁধের ফিতে আলগা করে দিয়েও যদি দেখো শুধুমাত্র কোমরের ওপরেই ভর করে পুরো রুকস্যাক বয়ে নেওয়া যাবে তাহলে ব্যাগটা নেওয়া যেতে পারে।

তবে, কিছু কোম্পানির রুকস্যাক আছে যেগুলো নিজের শরীরের হাইট অনুযায়ী ব্যাগের কাঁধের অংশ ওপর নিচ সরিয়ে অ্যাডজাস্ট করে নেওয়া যায়।

আরও একটা উপায় আছে সঠিক ট্রেকিং ব্যাগ বা রুকস্যাক বাছাই করার

নিজের শরীরের টরসো মেপে রুক্‌স্যাক কেনার পদ্ধতি। ট্রেকিং-ব্যাগ কেনার সময় এই পদ্ধতি ব্যাবহার করলে একদম সঠিক মাপের ব্যাগ বাছাই করা সম্ভব হয়। টরসো মাপার পদ্ধতি জানতে এখানে ক্লিক্‌ করো।

২। ট্রেক অনুযায়ী রুকস্যাক

মোট পুরো ট্রেকের দিন ও কেমন জিনিসপত্র লাগবে সেই অনুযায়ী ব্যাগের প্রকার বিভিন্ন হয়ে থাকে। তুমি নিজে কিরকম ট্রেক করো সেই অনুযায়ী ব্যাগ বাছাই করতে পারো-

  • ছোট ব্যাকপ্যাক বা Daypacks

এক বা দুই দিনের হলে একটা ছোট ল্যাপটপ ব্যাগ -এর মতো ডে-প্যাক হলেই হয়ে যায়। এই ব্যাগগুলো সাইজে ছোট, ওজনেও হাল্কা হয়, মোটামুটি 25 থেকে 35 liter সাইজের হয়ে থাকে।

  • এক’দু দিনের বেশি ট্রেক হলে

চার পাঁচ দিন বা এক্সপ্তাহের জন্য হলে মোটামুটি 45L থেকে 55L -এর ব্যাগ হলেই হয়ে যায়। এই ব্যাগগুলোর মধ্যে ৯ থেকে ১২, ১৩ কেজি ওজনের জিনিশপত্র অনায়াসে ক্যারি করা যায়। এবং এই ব্যাগ দিয়েই মোটামুটি একসপ্তাহ থেকে ১৫ দিন পর্যন্ত ট্রেক করতে কোনও অসুবিধা হয়না।

কি এই লিটার? 50L, 65L মানে কি আসলে এতো ওজনের মালপত্র নিতে পারে? তা নাহলে 35L, 50L, 65L নতুন রুকস্যাকের গায়ে এগুলোর মানে কি? বিশদে জানতে ক্লিক করো এখানে!

  • এক্সপেডিশনের জন্য রুকস্যাক Rucksack

আর যদি এক্সপেডিশন হয়, তখন 65 liter থেকে 70, 80 এমনকি 90 liter -এর ব্যাগও নিয়ে যায় অনেকে। এই ব্যাগগুলো ১৫ কজি থেকে ৩০ কেজি পর্যন্ত ওজন বইতে পারে। ব্যাগের ভেতরে অ্যালুমিনিয়াম কিংবা স্টিলের ফ্রেম থেকে শুরু করে উন্নত প্রযুক্তির টেকসই কাপড় দিয়ে ব্যাগগুলোকে তৈরি করা হয় পর্বতারোহণের সময় কঠিন পরিস্থিতিতে মোকাবিলা করার জন্য।

  • একদিনের অথচ রুকস্যাক নিতে হচ্ছে –

এই পরিস্থিতিও আসে, দেখা গেল এক দুই দিনের ট্রিপ অথচ সেখানে গিয়ে ক্লাইম্বিং, বল্ডারিং, রিভার ক্রসিং এরকম কিছু করতে যাচ্ছ। সেক্ষেত্রে কিন্তু নিজের জামাকাপড়, খাওয়ার ছারাও বিভিন্ন অ্যাক্টিভিটিমুলক ইকুইপমেন্ট, রোপ এইসব ক্যারি করতে হচ্ছে। তখন কিন্তু বড় রুক্‌স্যাক লাগতে পারে। এটা খুব ব্যাতিক্রম হয় যারা এক্সট্রা অ্যাক্টিভিটির মধ্যে নিযুক্ত শুধুমাত্র তাদের ক্ষেত্রেই হতে পারে।

ট্রেকের দিন এবং অ্যাক্টিভিটি অনুযায়ী ব্যাগ বাছাই করার হেরফের হয়। তাই সবার প্রথমে একটা লিস্ট বানিয়ে নিয়ে তারপর ব্যাগ বাছাই করা সবথেকে ভালো।

৩। নতুন রুকস্যাক ওয়াটারপ্রুফ কি না!

ট্রেকিং ব্যাগ বা রুকস্যাক সবসময়ের জন্য অয়াটারপ্রুফ (water proof) কি না পরিক্ষা করে নেবে। সাথে রেনকভার (raincover) আছে কিনা দেখে নেবে। সচরাচর ট্রেকিং ব্যাগের নিচে একটা ছোট্ট পকেটের ভেতরেই রেনকভার(raincover) রাখা থাকে। আর যদি না থাকে তাহলে অবশ্যই জোগাড় করে নেওয়া উচিৎ।

রেনকভার ব্যাগের আয়তন অনুযায়ী বড় ছোট হয়ে থাকে। নেওয়ার সময় রুকস্যাকে কভারটা পরিয়ে দেখে নেওয়া ভালো।

এরকম মনে হতেই পারে যে ব্যাগ তো নিজেই ওয়াটারপ্রুফ তাহলে আর রেনকভার নেওয়ার কোনও দরকার নেই। কিন্তু, এই ভুলটা করলে নিজেই পস্তাবে।

কারন, ব্যাগের রেনকভার যে শুধুমাত্র ব্যাগের ভেতরে জল ঢুকতে বাধা দেয় তা নয়। ব্যাগ কোথাও ঘষা খেয়ে বা ঝোপ ঝাড়ের খোঁচা লেগে ছিঁড়ে যাওয়ায় হাত থেকেও বাঁচায়।

তাছাড়াও, ধারালো পাথর, কাদা, বরফ এসবের হাত থেকেও অনেকটাই রক্ষা করে এই রেনকভার। 

৪। রুকস্যাকের প্যাডিং এবং এয়ারফ্লো

প্রায় সব নতুন রুকস্যাকের হাতল, কোমর ও পিঠে স্পঞ্জ অথবা ফোমের প্যাডিং ব্যাবহার করা হয়ে থাকে। স্পঞ্জের না নিয়ে ফোমের প্যাডিং বিশিষ্ট ব্যাগই নেওয়া ভালো। কিছু ব্যাগে দেখবে হাতলের প্যাডিং –এর দুই ধারে অতিরিক্ত কাপড় দিয়ে বর্ডার বানানো থাকে। এই বর্ডারগুলো প্যাডিং-এর থেকে পাতলা ও শক্ত ধরনের হয়।

ট্রেকের সময় অনেকক্ষন হাঁটার পর লোড বেশি পড়ে এবং রুকস্যাকের হাতলের প্যাডিং পাতলা হয়ে যায়। সেইসময় হাতলের দুই ধারে থাকা বর্ডার, পাতলা চামড়া দিয়ে ঢাকা কাঁধের দুটো হাড় (Clavicle and Acromion) –এর ওপর ভীষণ চাপ পড়ে ও ঘষা খেতে থাকে। কখনও কখনও কালশিটে দাগ হয়ে যায় এই বর্ডারের কারনে। তাই ব্যাগ নেওয়ার সময় খেয়াল করবে এই বর্ডার যেন না থাকে।

সারাদিন হাঁটার ফলে অনেক সময় ঘামে পিঠ ভিজে গিয়ে অস্বস্তিকর অবস্থা তৈরি হয়। তাই রুক্‌স্যাকের পেছনের যে অংশ পিঠে লেগে থাকে সেই জায়গায় যাতে ভালো হাওয়া পাশ করার ব্যাবস্থা থাকে খেয়াল রাখবে।

৫। রুকস্যাকের মেরুদণ্ড

আজ্ঞে হ্যাঁ, ট্রেকিং ব্যাগের মেরুদণ্ড থাকে। ব্যাগের ভারে মানুষের শরীরের মেরুদণ্ড বা শিরদাঁড়া যাতে আঘাতপ্রাপ্ত না হয়, সেই জন্য আধুনিক ট্রেকিং ব্যাগের ভেতরেও মেরুদণ্ডের ব্যবস্থা করা হয়ে থাকে। একটা লম্বা অ্যালুমিনিয়াম দণ্ড ব্যাগের মাঝ বরাবর ঢুকিয়ে সেলাই করে দেওয়া হয়। যার ফলে রুক্‌স্যাক সোজা হয়ে থাকতে পারে। কিছু কিছু ব্যাগে সরু একটা বা দুটো দন্ড থাকে আবার কিছু ব্যাগে সম্পূর্ণ অ্যালুমিনিয়াম প্লেট বসানো থাকে।    

৬। চেনের কোয়ালিটি কেমন নতুন রুকস্যাকে!

রুকস্যাক নেওয়ার সময় অবশ্যই চেন(Zipper) – এর কোয়ালিটি ভালো করে দেখেশুনে নেবে। চেন বারবার খুলে ও বন্ধ করে দেখবে। সাধারনত, লোকাল ব্যাগের চেন উলটো করে, জোড়া মুখটা ভেতরে দিকে ঘুরিয়ে সেলাই করা থাকে। যার ফলে কেটে যাওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে।

বিদেশি ব্যাগের চেনের জোড়া মুখ সোজা করেই লাগান হয়, যেটা দেখলে মনে হয় যেন ওয়াটার প্রুফ চেন। তাই যেকোনো ব্যাগ নেওয়ার সময় সেলাই, চেনের লক এবং চেন কেটে যাওয়ার চান্সেস আছে কি চেক করে নেবে।

৭। রুকস্যাকে অতিরিক্ত পকেট, স্লিপিংম্যাট এবং আইসএক্স আটকানোর ব্যাবস্থা আছে কি নেই

এখনকার বেশীরভাগ ট্রেকিং ব্যাগেই দু’পাশে অতিরিক্ত পকেট ও জলের বোতলের জন্য জায়গা থাকেই। যেগুলো দেখে নিতে হবে সেগুলো হল

  1. রুকস্যাকের গায়ে স্লিপিং ম্যাট আটকে রাখা যাবে কি না।
  2. রুকস্যাকের গায়ে আইসএক্স আটকানোর লুপ বা অন্য কোনও ব্যাবস্থা করা যাবে কি
  3. ব্যাগকে চেপে ছোট করার জন্য অতিরিক্ত ফিতে।
  4. কোমরের ফিতের কাছে পকেট (Waist Pocket)
  5. চেস্ট বেল্টের মধ্যে এমারজেন্সি ছোট্ট বাঁশি

নতুন রুকস্যাক নেওয়ার সময় কিছু প্রয়োজনীয় সাজেশন তোমাদের জন্য –

  • যে কোনও ব্যাগ কেনার আগে প্রথমে ব্যাগের ফিতেগুলো আলগা করে ভাল করে চেক করে নেবে।
  • তারপর, হিপ্‌বেল্টের লক আটকে নেওয়ার পরেও যদি ফিতের ২ থেকে ৩ ইঞ্ছি অবশিষ্ট অংশ টাইট করার জন্য বেঁচে থাকে তাহলেই ভাল। কারন, আপহিল এবং ডাউনহিলে ওঠা নামা করার সময় সহজে অ্যাডজাস্ট করা যায়।
  • নতুন রুকস্যাক নেওয়ার সময় পারলে কিছু ওজন ব্যাগের ভেতরে নিয়ে, ব্যাগকে নিচে রেখে, হাঁটুর সাথে সমান্তরাল করে দেখে নেওয়া উচিৎ। বেশি নিচু হলে ভারি ব্যাগ কাঁধে ওঠাতে অসুবিধার সম্মুখীন হতে হয়।

ব্যস, নিজের নতুন রুকস্যাক(rucksack) কেনার সময় মোটামুটি এইসব ব্যাপারগুলো চেক করে নিতে পারলেই হল। কেমন লাগল ব্লগটা অবশ্যই পড়ে জানাবে।

নতুন নতুন ব্লগ শুরু করেছি, যদি কিছু বাদ দিয়ে থাকি অবশ্যই কমেন্টে জানাবে। এবং যদি ট্রেকিং এর খুঁটিনাটি বিষয়ে আরও কিছু জানার থাকে নিচে কমেন্ট বক্সে অবশ্যই প্রশ্ন করতে পারো। চেষ্টা করব যতটা সম্ভব সাহায্য করার। ওহ হ্যাঁ! ব্লগটা ভাল লাগলে শেয়ার করো।