এক্সপোজারের ত্রিকোনপ্রেম

বন্ধুদের গ্রূপে কারও হাতে ডিজিটাল এস এল আর ক্যামেরা থাকলে তাকে যেন অন্য বন্ধুরা একটু বেশি গুরুত্ব দেয় বা কেউ হয়তো মোবাইল এ ছবি তুলতে খুব পছন্দ করি মনে হতেই পারে একটা ক্যামেরা কিনেই ফেলি। কেনার পর আমরা অনেকেই সমস্যার মুখে পড়ে যাই যখন দেখি ওরে বাবারে এত এত কি সেটিংস, এতগুলো বোতাম কোনটা কি যে করে।

সবাই হয়তো ডিজিটাল ক্যামেরার পুরোপুরি ব্যবহার করে উঠতে পারিনা। মোবাইল ক্যামেরা, পয়েন্ট এন্ড শুট বা ডিজিটাল এস এল আর প্রায় সব ক্যামেরাই কিন্তু একই নিয়মে ছবি তোলে। সব ক্যামেরার ভেতর প্রায় যেসব সেটিংস কমনলি ব্যাবহার হয় আমরা দেখবো সেগুলো কিভাবে কাজ করে।

কিছু সাধারণ জ্ঞান : শপিং এ গেলে যেমন আমরা একটু সার্ভে করে নি কোন জিনিসটা কোথায় ভালো পাওয়া যায়. তেমনই ক্যামেরা ব্যবহার করার আগে একটু কামরার কোন সেটিং কোথায় গিয়ে চেঞ্জ করা যায় জেনে নেওয়া ভালো.

প্রায় সব ডিজিটাল এস এল আর ক্যামেরাতে প্রথমেই একটা জিনিস লক্ষ্য পড়ে একটা বড় চাকা, যার ওপরে ছোট ছোট A, M, P, S, Auto এইসব লেখা থাকে. ক্যামেরার পেছনেই একটা বড় স্ক্রিন থাকে যেখানে ছবি তোলার আগে অনেক ইনফরমেশন দেখায়.

অটোমোডেফটো: ডিজিটাল ক্যামেরার ভেতরে এমন কিছু সেটিংস আগে থেকে ঠিক করা থাকে যাতে করে যেকেউ প্রথম ব্যবহার করতে গেলেই তাকে বিশেষ বেগ না পেতে হয়। অটোমেটিক মোড এ ছবি তোলার সময় ক্যামেরাই ঠিক করে নেয় যেকোনও পরিবেশে ক্যামেরার সেটিংস কেমন হবে যাতে করে ছবি ঠিক ঠাক তোলা হয়।

ম্যানুয়াল মোড: ক্যামেরার চাকা ঘুরিয়ে মানুয়াল মোড বাছাই করে কামেরার যাবতিয় কন্ট্রোল নিজের হাতে বাছাই করে নিয়ে কাজ করা যায়. তুমি হয়ত কামেরার বোতাম চেপে ফোকাস এ আনতে চাইছ একটা অবজেক্টকে অথচ ক্যামেরা সেটা বুঝজতে পারছেনা বার বার আউট অফ ফোকাস হয়ে যাচ্ছে তখন ম্যানুয়াল সেটিং বাছাই করে যেই ফোকাস রিং তা নিজে ঘুরোবে দেখবে ঠিক ফোকাস নিয়ে নিয়েছে.

এক্সপোজার-এর ত্রিকোনপ্রেম:

কিভাবে ক্যামেরার ভেতরে প্রবেশ করে আলো সেন্সর এর সাথে ইন্টারাক্ট করে ছবির মধ্যে আলোর তারতম্য নিয়ন্ত্রণ করে এক্সপোজার হল এই আলো পরিমাপের মাপকাঠি। এই এক্সপোজার নিয়ন্ত্রিত হয় তিনটি নিয়ম মেনে আই এস ও, শাটার স্পিড ও অ্যাপারচার। ক্যামেরার এই তিনটি সেটিং একসাথে সামঞ্জস্য রেখে কাজ করে চলে। এদের একটা ছাড়া আর বাকি দুটো অচল। চলো এইবার আমরা এই তিনটি সেটিংস নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট করে দেখি কে কেমন ভাবে একে অন্যের সাথে মিশে কাজ করছে।

  • কীরকম ভাবে কাজ করে-

ধরা যাক ক্যামেরা হল পাল্লা সহ একটা জানালা যেটা খোলা এবং বন্ধ করা যায়. অপারচার হল জানালার সাইজ. জানালা যত বড় হবে তত বেশি আলো ঘরের ভেতরে ঢুকে ঘর আলোময় করে তুলবে. সাটার স্পিড হল জানালার পাল্লা, যত বেশিক্ষন খোলা থাকবে বাইরের আলো ততক্ষন ঘরের ভেতরে প্রবেশ করবে জানালা বন্ধ করে দিলেই আলো কমে যাবে. এইবার ভাবা যাক জানালা খুলে সানগ্লাস পরে বাইরে দেখছ বাইরের আলো অতটাও চোখে লাগবে না এইটা হল লো আই এস ও এর মাপকাঠি যদি সানগ্লাস খুলে দেওয়া যায় তাহলে আরও বেশি পরিষ্কার দেখতে পাওয়া যাবে. এখানে তোমার চোখ হল ক্যামেরার ভেতরে থাকা সেন্সর যাকে আই এস ও এর সানগ্লাস পরানো আছে.

এক্সপোজার এর ওপর দক্ষতা পেতে হলে অনেক প্র্যাকটিসের দরকার. মনে রাখতে হবে প্রত্যেকটা সেটিংস যে শুধুমাত্র ছবির আলো নিয়ন্ত্রণ করে তা নয় ছবির অন্যান্য দিকেও প্রভাব ফেলে.

তবে ডিজিটাল ক্যামেরার ভাল দিক হল ফটোগ্রাফি শেখার জন্য এটা সবথেকে সুবিধাজনক. এতে প্র্যাক্টিস করার জন্য যত ইচ্ছে ছবি তোলা যায় বাড়তি খরচ না করে অথচ এটাতে অটোমেটিক মোড, ম্যানুয়াল মোড বা সেমি অটোমেটিক যেমন অপারচার প্রায়োরিটি, সাটার প্রায়োরিটি যেগুলো ব্যবহার করলে এক্সপোজারের একটা বা দুটো সেটিং নিজে কন্ট্রোল করা যায় বাকি সেটিংস গুলো ক্যামেরা নিজে অটোমেটিক্যালি নিয়ন্ত্রণ করে নেয়. এক্সপোজারের এই তিনটে সেটিংস নিয়ে অনেক বিশদে আলোচনা করা যেতে পারে.

আইএসস্পিড:

প্রথম যে সেটিং নিয়ে আমরা এক্সপেরিমেন্ট করবো সেটা হল আই এস ও (ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশন ফর স্ট্যান্ডার্ডাইজেশন). ডিজিটাল ক্যামেরায় আই এস ও স্পিড দিয়ে মাপা যায় কোন ক্যামেরার ইমেজ সেন্সর কতটা আলোক সংবেদনশীল। বেশিরভাগ সময় সবাই ফটো তোলার টেন্ডেন্সি থাকে অটোমেটিক মোডে, যেখানে ক্যামেরা নিজেই সাবজেক্ট এর পরিবেশ অনুযায়ী ঠিক করে নেয় আই এস ও স্পিড এর পরিমাপ। তবে প্রায় ক্যামেরাই সুযোগ দেয় নিজেদের সুবিধামত সেটিং ঠিক করে নেওয়ার।

সাধারণত ক্যামেরার মধ্যে আই এস ও এর মাপকাঠি লোয়েস্ট ৫০, ১০০, ২০০ বা ৪০০ থেকে হাইয়েস্ট ৮০০, ১৬০০ বা তারও বেশি হতে পারে. অন্ধকার পরিবেশে বা যেখানে আলোর পরিমান খুব কম যদি এমন জায়গায় সাটার স্পিড কম অবস্থায় ছবি তুলতে হয় তাহলে আই এস ও স্পিড বাড়িয়ে মোটামুটি ৩২০০ তে বা তার ও বেশি রেখে ছবিটা তুলতে হয়। এই ক্ষেত্রে দেখা যায় যত বেশি আই এস ও স্পিড রাখা হয় তত বেশি পরিমান নয়েজ বা ফটোগ্রাফি ভাষায় গ্রেইন এর পরিমান বেড়ে যায় ছবির মধ্যে। আবার যদি ভালো পরিমান আলো বা দিনের আলোতে ছবি তোলা হয় সেক্ষেত্রে আই এস ও স্পিড কম ১০০ বা ২০০ তে রেখে ছবি তোলা হয়। সাধাতনত আই এস ও ১০০ কে স্বাভাবিক মাপকাঠি ধরা হয় যেটা খুব সুন্দর চকচকে কম গ্রেইন এমন ছবি প্রদান করে। আই এস ও এর স্পিড যদি ম্যানুয়ালি বাড়ানো হয় তাহলে দেখা যাবে সাটার স্পিড এবং অ্যাপারচার এর সংখ্যার হেরফের হয়েছে।

অ্যাপারচারের খেলা :

সুন্দর ব্যাকগ্রাউন্ড ব্লার হয়ে যাওয়া প্রোফাইলের ছবি হোক বা কনও ফুলের পরাগ রেনু বা কনও মৌমাছির চোখের ছবি যেটা দেখে মনে হয় যেন অনুবিক্ষন যন্ত্র দিয়ে ছবি তলা হয়েছে সবার মুলে রয়েছে এই অ্যাপারচারের খেলা। অ্যাপারচার হল কামেরার লেন্সের মধ্যেকার ফুটো অংশ যেই রাস্তা ধরে আলো পৌঁছে যায় ক্যামেরা সেন্সরে। প্রত্যেক ক্যামেরা মানুষের চোখের মতো করে ডিজাইন করা হয়েছে। ক্যামেরার লেন্সের সামনের এলিমেন্টস মানুষের চোখের কর্নিয়ার মতই কাজ করে। আর ফটোগ্রাফির ক্ষেত্রে চোখের মনি হল ক্যামেরার অ্যাপারচার। কনও বস্তুর ওপর আলো পড়লে সেই আলোটা এসে চোখের কর্নিয়ার ওপর পড়ে। কর্নিয়া আবার সেই আলোকে ভেতরের দিকে বেঁকিয়ে চোখের মনির মধ্যে ফেলে তবে গিয়েই মনির পেছনে থাকা রেটিনার দারা আমরা বস্তুটিকে দেখতে পাই। ঠিক তেমনই ক্যামেরার এলিমেন্টগুলো আলোকে বেঁকিয়ে লেন্সের মধ্যে থাকা অ্যাপারচারের ওপর ফেললে অ্যাপারচারের পেছনে থাকা সেন্সরের সাহায্যে ক্যামেরা দেখতে পায়।

চোখের মনির চারদিকে একটা পেশি থাকে আইরিশ যেটা চোখের মণিকে ছোট ও বড় হতে সাহায্য করে আলোর পার্থক্যের ওপর নির্ভর করে। সেইরকমই ক্যামেরার লেন্সের ভেতরে অ্যাপারচারের চারিদিকে ডায়াফ্রেম থাকে যে অ্যাপারচারকে ছোট ও বড় হতে সাহায্য করে। ফটোগ্রাফিতে অ্যাপারচারকে চিন্নিত করা হয় F stop বা F Number দিয়ে। এফ স্টপ নাম্বার দিয়ে হিসেব করা হয় অ্যাপারচার কতোটা খোলা বা বন্ধ রয়েছে। এফ নাম্বার যত কম হবে অ্যাপারচার তত বড় হবে ও বেশি আলো পাশ করবে। এফ নাম্বার যত বেশি হবে অ্যাপারচার তত ছোট হবে কম আলো যাবে ক্যামেরার সেন্সরে। এখানে ১.৪ এফ স্টপ নাম্বারে অ্যাপারচার সাইজ ৩.৫ বা ১১ -এর থেকে অনেক বেশি হবে।

মজার ব্যাপার হল এফ স্টপ ১৬ অ্যাপারচার হলে যেকোনও বস্তুর ব্যাকগ্রউন্ড ও ফরগ্রাউন্ড সব একসাথে ফোকাসে চোলে আসে আর যদি এফ স্টপ ১.৮ বা তার ও কম হয় তাহলে শুধুমাত্র বস্তুটি ফোকাসে এনে শার্প হয়ে ব্যাকগ্রাউন্ড টা ব্লার করে ছবিটা আসে এটাকে ডেপথ অফ ফিল্ড বলে। অ্যাপারচার যেকোনও সাবজেক্ট কে ফোকাস করে ছবি তুলতে সাহায্য করে।

সাটার স্পীড –

কনও পাখি উড়ে যাওয়া থেকে শুরু করে খেলার মাঠের ছবি। বান্ধবি ডান্স রিয়্যালিটি শো তে ডান্স করছে অথচ মোবাইলে ফটো তুলতেই দেখলাম ছবিটা নড়ে গেছে সেই কিছুতেই ভাল করে ছবি আসছেনা। এই খানে কাজ করে শাটার স্পীড। চোখের পলকে ঘটে যাওয়া মুহূর্তের ছবি তোলা হয় শাটার স্পীড কন্ট্রোল করে। আমাদের চোখের পাতা যেমন বন্ধ করি আবার খুলি ক্যামেরার শাটার আছে সেটা চোখের পলকের কাজ করে। মদ্যা কথায় তোমার ক্যামেরা কত তাড়াতাড়ি ছবি তুলতে পারে সেটা একমাত্র শাটার স্পীড বলে দেবে।

তবে নাইট ফতগ্রাফি করতে গেলে এই ক্যামেরার দরজা মানে শাটার একটু বেশিক্ষনই খোলা রাখতে হয়। শাটার স্পীড ঠিক করে ক্যামেরার সেন্সরের মধ্যে আলো কত সময় ধরে ঢুকবে। একটা সাধারন ডিজিটাল এস এল আর এ ছবি তোলার জন্য ক্লিক করলে একটা মিরর উপরের দিকে সরে আলোকে লেন্সের ভেতর থেকে পাশ করিয়ে ক্যামেরা সেন্সরে পাঠিয়ে দেয়। একবার মিরর টা ওপরের দিকে উঠে গেলে একটা ছোট দরজা উপর দিক থেকে নিচে খুলে গিয়ে ক্যামেরা সেন্সরকে উন্মুক্ত করে দেয়। তারপর আরও একটা দরজা ওপর থেকে নিচে পড়ে ক্যামেরা সেন্সরকে ঢাকা দিয়ে ফেলে ও উপরে উঠে থাকা মিররটা আবার ঢাকা পড়ে যায়। তারপরেই ভেতরের সেন্সরটা আবার তার নিজের জায়গায় রিসেট হয়ে যায়। অটোমেটিক মডে ছবি অনুযায়ী ক্যামেরা নিজেই ঠিক করে নেয় কতক্ষন সেন্সরকে খোলা রাখবে ছবি তোলার জন্য। তোমরা এটা পালটে নিজের পছন্দ মত ক্যামেরায় থাকা হুইল ঘুরিয়ে শাটার প্রায়োরিটী মোড যেটা করলে তুমি শাটার স্পীড কন্ট্রোল করবে বাকি আই এস ও আর অ্যাপারচার ক্যামেরা ঠিক করে নেবে বা ম্যানুয়াল মোড যেখানে শাটার স্পীড, আই এস ও এবং অ্যাপারচার তিনটেই নিজে ক্যামেরাতে সেট করতে পার। শাটার স্পীড হিসেব করা হয় সেকেন্ডের মাপ ধরে।

বেশিরভাগ ক্যামেরা শাটার স্পীড ১/৪০০০ পার সেকেন্ড বা মাঝেমধ্যে ১/৮০০০ পার সেকেন্ড থেকে ৩০ সেকেন্ড পর্যন্ত হতে পারে ক্যামেরার ওপর নির্ভর করে পার্থক্যগুলো। ১/৪০০০ পার সেকেন্ড ই যথেষ্ট হয় ফাস্ট ছবি তোলার ক্ষেত্রে। সাধারন ছবি তোলার জন্য ১/১০০ পার সেকেন্ড স্পীড এই হয়ে যায়। হাতে ক্যামেরা ধরে ছবি তুলতে গেলে শাটার স্পীড বেশি হয়ে গেলে ছবি নড়ে ব্লার হয়েও যেতে পারে। তবে অনেক লেন্স নির্মাতারা লেন্সের মধ্যে ভাইভ্রেসান রিডাকশান প্রযুক্তির ব্যাবহার করছে। যার ফলে ছবি মোসান হওয়ার চান্স অনেক কমে গেছে।

বেশি সময়ের শাটার স্পীড ২০ বা ৩০ সেকেন্ডের নাইট ফটোগ্রাফিতে ব্যাবহার করা যায়। এমনও হতে পারে তুমি হয়ত মিল্কিওয়ের ছবি তুলে ফেললে।